অলিউর রহমান তামিম: গোলাপগঞ্জে তেল ছেড়ে সিএনজিতে রূপান্তরের মাধ্যমে কালো ধোঁয়ার হাত থেকে মুক্তি মিলেছে। তবে তদারকির অভাব আর পরিবহন মালিকদের উদাসীনতায় সিএনজিচালিত গাড়ির একটা বড় অংশই পরিণত হয়েছে চলন্ত বোমায়। সচেতন মহল বলছে, পুনঃপরীক্ষা বা রিটেস্টিং ছাড়াই সড়কে চলছে অন্তত ৪০ শতাংশ সিএনজি সিলিন্ডারযুক্ত গাড়ি।

সিএনজি গ্যাস সিলিন্ডার ও রিফুয়েলিং নিয়ে সিলেট সহ-গোলাপগঞ্জে চলছে ভয়াবহ অনিয়ম। সিলিন্ডারগুলো পাঁচ বছর পর পর রিটেস্ট করানোর নিয়ম থাকলেও স্থানীয় পরিবহন মালিকরা তা মানছেন না। একইভাবে ফিলিং স্টেশনে রিফুয়েলিংয়ের আগে সিলিন্ডার মেয়াদোত্তীর্ণ যাচাইয়ের কথা থাকলেও কেউ তা না মানায় দিন দিন গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়েই চলছে।

গ্যাস সিলিন্ডার দেখলেই মনে হয়ে যায় চুখের সামনে ঘটে যাওয়া সেই ৬ (মার্চ) বুধবারের কথা। তখন বিকেল সাড়ে ৩টা চোখের সামনেই সিলেটের হেতিগঞ্জ বাজারে চলন্ত সিএনজি অটোরিকশার শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লেগে অটোরিকশা পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এমন ঘটনা দেখামাত্র লোকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

সিএনজিতে কি ভাবে আগুল লেগেছে? জানতে চাইলে সিএনজি চালক ফয়জুর রহমান বলেন, সিলেট থেকে গোলাপগঞ্জের উদ্দেশ্যে হেতিমগঞ্জ বাজার আসামাত্র হঠাৎ চলন্ত গাড়িতে (সিএনজি অটোরিকশা) গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়ে যায়। এসময় আমি সহ গাড়িতে থাকা দু’জন যাত্রী চলন্ত গাড়ি থেকে দ্রুত নেমে যাই। অল্পের জন্য বেঁচে যায় তিনটি তাজা প্রাণ।

পরে স্থানীয় ও ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের সহযোগিতায় আগুন নিয়ন্ত্রণ করলেও বিস্ফোরিত সিএনজি অটোরিকশা আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

এ ঘটনার কিছুদিন আগে গত (২৫ জানুয়ারি) শুক্রবার রাত সাড়ে ৭টায় গোলাপগঞ্জের চৌমুহনীর একটি দোকানে গ্যাস সিলিন্ডার থেকে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় অল্পের জন্য রক্ষা পান গোলাপগঞ্জ চৌমুহনীর লোকজন। ঘটনার সাথে সাথে যানবাহন পথচারিদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পৌর চৌমুহনীর বিসমিল্লাহ এন্ড মিষ্টি ঘরের গ্যাস সিলিন্ডার থেকে আগুনের সূত্রপাত ঘটে। মুহূর্তে আগুনের লেলিহান শিখা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এসময় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সহযোগীতায় প্রায় ৩০মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রনে আসে।

এদিকে গত (৩০ মার্চ) শনিবার
দিবাগত রাত ১১টার দিকে সিলেট-কানাইঘাট সড়কের শাহপরাণ থানাধীন পীরের চক এলাকার এ আরবি ব্রিকস ফিল্ডের সামনে সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে পুড়েছে একটি সিএনজি চালিত অটোরিকশা ও দুইটি বাইসাইকেল। তবে এ ঘটনায় অক্ষত রয়েছেন যাত্রী ও চালক।

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, হঠাৎ বিকট শব্দে অটোরিকশার সিএনজি সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়। এসময় ভেতরে থাকা একজন যাত্রী ও চালক লাফ দিয়ে নেমে আত্মরক্ষা করেন।

তবে সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে আগুন ধরে যাওয়ায় অটোরিকশা ও ভেতরে থাকা দুইটি বাইসাইকেল পুড়ে যায়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।

গত কয়েক বছরে সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা গোলাপগঞ্জে অহরহ ঘটেছে। ঘটছে প্রাণহানিও, অপচয় হচ্ছে সম্পদের। যাত্রীরা বলছেন, মানহীন ও সময়মত পুনঃপরীক্ষা না করানোই এসব দুর্ঘটনার মূল কারণ।

নিজাম উদ্দিন নামে এক বাসচালক বলেন, একটা সিলিন্ডারের মেয়াদ পাঁচ বছর সেটা আমরাও জানি। মহাজন (মালিক) সেই সিলিন্ডার না পাল্টালে আমরা কী করব বলেন? তাই সাধারণ যাত্রীদের মতো আমরাও ঝুঁকিতে রয়েছি।’

২০০৩ সাল থেকে গোলাপগঞ্জে সিএনজি চালিত গাড়ি চলাচল শুরু করে। প্রতি তিন থেকে পাঁচ বছর পরপর পরীক্ষা করার নিয়ম থাকলেও অনেক পরিবহন মালিক টাকা বাঁচাতে সিলিন্ডারগুলো নির্দিষ্ট সময় পরপর পুনঃপরীক্ষা করছেন না।

অনিয়মের সুযোগে গোলাপগঞ্জে প্রায় গাড়িই মেয়াদোত্তীর্ণ এবং বিপজ্জনক সিলিন্ডার নিয়ে চলাচল করছে বলে জানা গেছে।

বিভিন্ন সূত্রে আরো জানা গেছে, গোলাপগঞ্জে চলছে প্রায় অর্ধলক্ষের ও বেশি গাড়ি। গোলাপগঞ্জে বেশিরভাগ সিএনজি চালিত গাড়ি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় চলাচল করছে। বেশিরভাগ সময় সিলিন্ডার থেকে কোনো ধরণের দুর্ঘটনা ঘটলে ভয়াবহ প্রাণহানির আশঙ্কা থাকে।

সরকার শিগগিরই কঠোর পদক্ষেপ না নিলে আগামী এক বছরে সিএনজি সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা অনেক বেড়ে যেতে পারে। গত দেড় বছর ধরে সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। নকল সিলিন্ডার, মানহীন সিলিন্ডার বাল্ব ও এসেস পাইপের পরিবর্তে এমএস পাইপ ব্যবহারের কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে বেশি।

বিস্ফোরক অধিদপ্তর ও আরপিজিসিএল সূত্রে জানাযায়, সিএনজি সিলিন্ডারগুলোর ধারণক্ষমতা ৩ হাজার পিএসআই (প্রেসার পার স্কয়ার ইঞ্চি)। কিন্তু রিফুয়েলিং স্টেশনে গ্যাসভর্তি করা হয় প্রায় ৫ হাজার পিএসআইয়ে। প্রতিনিয়ত বাড়তি চাপ নিতে হয় বলে পুরু ইস্পাতে সিলিন্ডারগুলো তৈরি করা হয়। একেকটি সিলিন্ডারের সর্বোচ্চ মেয়াদ ২০ বছর হলেও বাড়তি চাপের কারণে ৫ বছর অন্তর অন্তর রি-টেস্ট জরুরি। কিন্তু সে নিয়ম কেউ মানছে না।

নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি সিলিন্ডার ৫ বছর অন্তর পরীক্ষা করানোর কথা থাকলেও তা মানছে না কোন চালক। এতে মালিক ও চালক তাদের ইচ্ছেমত পরীক্ষা করাচ্ছেন বা পরীক্ষা ছাড়াই চলছে একেকটি চলন্ত বোমা। আর ঘটছে দুর্ঘটনা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যদি রিটেস্ট বা পুনঃপরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয় তাহলে কমবে ঝুঁকি আর বাঁচবে জীবন।

শেয়ার করুনঃ