মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে না ফেরার দেশে চলে গেলেন ফেনীর সেই দগ্ধ ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি। বুধবার (১০ এপ্রিল) রাত সাড়ে ৯টার সময় তার মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপতালের বার্ন ইউনিটের চিকিৎসকরা।

এর আগে গত মঙ্গলবার তার বাড়ি থেকে একটি চিঠি উদ্ধার করেছে সোনাগাজী মডেল থানা পুলিশ। যৌন হয়রানির পর এবং দগ্ধ হওয়ার কয়েকদিন আগে সহপাঠি দুই বান্ধবীর উদ্দেশে ঐ চিঠি লিখেছিলো নুসরাত। সেই চিঠি তার খাতা থেকে উদ্ধার করে পুলিশ।

চিঠিটি পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো:

‘‘তামান্না, সাথী,

তোরা আমার বোনের মতো এবং বোনই। ঔ দিন তামান্না আমায় বলেছিল, আমি নাকি নাটক করতেছি। তোর সামনেই বললো। আরো কি কি বললো, আর তুই নাকি নিশাতকে বলেছিস আমরা খারাপ মেয়ে। বোন প্রেম করলে কি সে খারাপ ??? তোরা সিরাজ উদ দৌলা সম্পর্কে সব জানার পরও কীভাবে তার মুক্তি চাইতেছিস। তোরা জানিস না, ওইদিন রুমে কি হইছে ? উনি আমার কোন জাগায় হাত দিয়েছে এবং আরো কোন জায়গায় হাত দেওয়ার চেষ্টা করেছে, উনি আমায় রুমের ভেতর বলতেছে— নুসরাত ডং করিসনা। তুই প্রেম করিসনা। ছেলেদের সাথে প্রেম করতে ভালো লাগে। ওরা তোরে কি দিতে পারবে? আমি তোকে পরীক্ষার সময় প্রশ্ন দেবো। আমি শুধু আমার শরীর দিতাম ওরে। বোন এই জবাবে উত্তর দিলাম। আমি একটা ছেলে না হাজারটা ছেলে…।

আমি লড়বো শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত। আমি প্রথমে যে ভুলটা করেছি আত্মহত্যা করতে গিয়ে। সেই ভুলটা দ্বিতীয়বার করবো না। মরে যাওয়া মানে তো হেরে যাওয়া। আমি মরবো না, আমি বাঁচবো। আমি তাকে শাস্তি দেবো। যে আমায় কষ্ট দিয়েছে। আমি তাকে এমন শাস্তি দেবো যে তাকে দেখে অন্যরা শিক্ষা নিবে। আমি তাকে কঠিন থেকে কঠিনতম শাস্তি দেবো। ইনশাআল্লাহ।’’

সুত্রে জানা যায়, তার পড়ার টেবিলে খাতায় দুই পাতার ওই চিঠিতে তামান্না ও সাথী নামের দুই বান্ধবীকে উদ্দেশ্য করে লেখা হয়েছে। গত ২৭ মার্চ ঘটে যাওয়া ঘটনার বর্ণনাও দিয়েছে নুসরাত। ওই চিঠিতে রাফি আত্মহত্যা করবেনা বলেও উল্লেখ করে সে। তবে যৌন হয়রানির ঘটনার পর সিরাজ উদদৌলাহ গ্রেফতার হলে তার মুক্তির দাবীতে বান্ধবীদের অংশগ্রহণে ক্ষোভ প্রকাশ করে সে। তাকে নিয়ে বান্ধবীদের বিভিন্ন কটুক্তিতেও তার মর্মাহত কথা উল্লেখ করা হয় চিঠিতে।

মাদ্রাসার পিয়ন নুরুল আমিন জানান, শতাব্দী প্রাচীন মাদ্রাসাটিতে নীচতলায় ছিলো অধ্যক্ষের কক্ষ। তিন-চার বছর আগে অধ্যক্ষের কক্ষটি মাদ্রাসার একটি নির্জন কক্ষে স্থানান্তরিত করা হয়। দরজা বন্ধ করে রেখে সেখানেই ছাত্রীদের সঙ্গে অপকর্ম করতো অধ্যক্ষ সিরাজুদ্দৌলা। ঘটনার দিন সেই কক্ষে আরেক পিয়ন দিয়ে নুসরাতকে ডেকে আনা হয়।

মঙ্গলবার সোনাগাজী মডেল থানার ওসি মো. মোয়াজ্জেম হোসেন চিঠিটি উদ্ধারের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, এটিও ওই ঘটনার আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে। চিঠিতে উল্লেখিতদের প্রয়োজনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে বলে জানান তিনি।

গত ২৭ মার্চ নুসরাত জাহান রাফিকে নিজ কক্ষে নিয়ে শ্লীলতাহানির অভিযোগে মাদরাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে সোনাগাজী থানায় একটি মামলা করে নুসরাতের পরিবার। ওই ঘটনার পর থেকে অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ্দৌলা কারাগারে রয়েছেন।

এরপর মামলাটি তুলে না নেওয়ায় অধ্যক্ষ তার অনুসারীদের দিয়ে নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা চালান বলে অভিযোগ উঠে। শরীরের ৮০ শতাংশের বেশি পুড়ে যাওয়ায় নুসরাতকে ঢামেকের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়।।

শেয়ার করুনঃ