সম্পাদকের কলম,

বিশুদ্ধ পানির অপর নাম জীবন, যা আমরা সবাই জানি। কিন্তু, আপনি জানেন কী, সিগারেটের অপর নামও জীবন! এটা শুনে আপনি আশ্চর্য হচ্ছেন নিশ্চয়। কেননা এতোদিন পর্যন্ত শুনে আসছেন ‘সিগারেট স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর’ কিংবা ধূমপানে বিষপান অথবা এটি হৃদরোগের কারণ’। সেই ক্ষতিকর বস্তুর অপর নামই যদি ‘জীবন’ হয় তবে তো আশ্চর্য হওয়ারই কথা। তবে আমি সত্যিই বলছি সিগারেটের আরেক নাম জীবন। তাহলে চলুন কিভাবে সিগারেটের অপর নাম জীবন হয় তা জেনে নিই।

প্রথমে সিগারেটের ক্ষতিকর দিকটা জেনে নেয়া যাক।

সিগারেটের ক্ষতিকর দিকঃ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বিভিন্ন বৈজ্ঞানিকগণসহ মোটামুটি সর্বজনীনভাবে এটি স্বীকৃত যে, ধূমপান যক্ষ্মা, ফুসফুসের ক্যান্সার-সহ নানা রোগের অন্যতম প্রধান কারণ এবং ধারক ও বাহক।

সিগারেটে আসক্ত একজন ব্যক্তি একাধিক জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনা থাকে। যার মধ্যে মরণব্যাধি ক্যান্সার অন্যতম।

সিগারেটের ধোঁয়ায় ক্যান্সার সৃষ্টিকারী মিউটাজেন থাকে। এই মিউটাজেন মানুষের মুখ, শ্বাসনালি, গ্রাসনালি এবং ফুসফুসে ক্যান্সার সৃষ্টি করে। বর্তমানে মোট ক্যান্সারে আক্রান্তদের মধ্যে অধিকাংশ রোগির রোগ সৃষ্টির মূলে রয়েছে সিগারেট আসক্তি। সিগারেটে থাকা নিকোটিন নামক বিষাক্ত পদার্থ ধোঁয়ার সাথে মানুষের দেহে প্রবেশ করে। সিগারেটের ধোঁয়া বের হয়ে আসলেও ধোঁয়ায় থাকা নিকোটিন মানব দেহে জমতে থাকে। একপর্যায় তা মানুষের রক্তের সাথে মিশে রক্তকে দূষিত করে ফেলে। এর প্রভাবে দেহে রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙ্গে পড়ায় নানা কঠিন রোগ দেখা দেয়।

সিগারেটে আসক্ত ব্যক্তি ব্রংকাইটিস নামের আরোও একটি জটিল রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাসনালিতে প্রদাহ এবং কাশির সৃষ্টি হয়। এতে শ্বাসনালি ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে পড়ে। যার ফলে হাঁপানি শ্বাসকষ্টের মতো জটিল রোগের সৃষ্টি হয়। এ রোগের প্রভাবে ব্যক্তির ফুসফুস অনেকাংশে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।

এছাড়া ধূমপানের ফলে শ্বাসনালিগুলোর বায়ুপথসমূহ সরু এবং ফুসফুসে অতি স্ফীতি দেখা দেয়। একে এমফাইসিমা বলে। এর ফলে ফুসফুসে জটিল পরিবর্তন লক্ষ্যিত হয়।

সিগারেটে আসক্তির ফলে উদ্গারি কাশিও দেখা দিতে পারে। এ জন্য অনেকের প্রচন্ড কাশি এবং কাশির সাথে ফুসফুস থেকে মিউকাস বেরিয়ে আসতে দেখা যায়।

তাছাড়া, সিগারেটে নিকোটিনসহ ৫৬টি বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে বলে গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে। যা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বলে সর্বদা প্রমাণিত হয়ে আসছে।

উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, ২০১০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে বিশ্বের ১৯২টি দেশে পরিচালিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয়, নিজে ধূমপান না করলেও অন্যের ধূমপানের (পরোক্ষ ধূমপান) প্রভাবে বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর প্রায় ৬,০০,০০০ মানুষ মারা যায়। এর মধ্যে ১,৬৫,০০০-ই হলো শিশু। শিশুরা পরোক্ষ ধূমপানের কারণে নিউমোনিয়া ও অ্যাজমায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর দিকে ঝুঁকে পড়ে। এছাড়া পরোক্ষ ধূমপানের কারণে হৃদরোগ, ফুসফুসের ক্যান্সার-সহ শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত রোগও দেখা দেয়। এ গবেষণা থেকে আরোও জানা যায়, পরোক্ষ ধূমপানে পুরুষের তুলনায় নারীর উপর বেশি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। পরোক্ষ ধূমপানের কারণে বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৮১,০০০ নারী মৃত্যুবরণ করেন।

উপরোল্লিখিত বিশ্বস্ত তথ্যসূত্র থেকে এটা প্রমাণিত যে সিগারেট স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এটি শুধু আসক্ত ব্যক্তিরই নয় বরং পরিবেশ তথা পরিবার, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী-সহ একটি দেশের পুরো জনগণের সুস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ

এ হুমকি অকাল কান্না বয়ে আনে। ভারী করে তুলে একটি দেশের রোগবালাইয়ের সংখ্যা।

শুধু কী তাই? এটি কতশত পরিবারের দুর্ভোগ বয়ে আনে তার কোনো ইয়ত্তা নেই।

এতক্ষণে আপনি নিশ্চয় বুঝে গেছেন সিগারেট আপনার জীবনকে কিভাবে ধ্বংসের মুখে ফেলে দেয়। এবার সিগারেটকে আপনার জীবন কল্পনা করুন। ভাবুন প্রতিটি টানে সিগারেট যেমন ক্ষয় হয় ঠিক তেমনি এটি আপনার জীবনকেও ধীরেধীরে ক্ষয় করতে থাকে। কল্পনা করুন সিগারেটের অগ্রভাগে আপনি আগুন ধরালেন মানে আপনার নিজের সুন্দর জীবনে আপনি আগুন ধরালেন। কল্পনায় দেখুন, আগুন ধরানোর ফলে সিগারেট ধীরেধীরে ক্ষয় হচ্ছে, এর সাথে ক্ষয় হচ্ছে আপনার সুন্দর জীবন।

কি দেখতে পাচ্ছেন? পুড়তে পুড়তে একসময় সিগারেট নিঃশেষ হয়ে যায়, ঠিক তেমনি আপনার জীবন বাতিটিও একসময় নিভে যায়। আর হ্যা এটাই করুণ বাস্তবতা!

তাই আমি যথার্থই বলে থাকি ‘সিগারেটের অপর নাম জীবন’। কারণ আপনি সিগারেট পোড়াচ্ছেন মানে আপনার জীবন পোড়াচ্ছেন। অতএব, সিগারেটকে সবসময় আপনার জীবন কল্পনা করুন। আর জীবনকে পোড়াতে না চাইলে সিগারেটে আগুন ধরানো থেকে বিরত থাকুন।

…..সালমান কাদের দিপু,
সম্পাদক, কুশিয়ারা নিউজ ডটকম

শেয়ার করুনঃ