কুশিয়ারা নিউজ ডেস্কঃ প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস ইতোমধ্যে বিশ্বের ২০৮টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে বিশ্বে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ৭৫ হাজার ৮৫৬ জনে। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৬৯ হাজার ৫’শ ১৪ জনের, এর বিপরীতে সেরে উঠেছেন ২ লাখ ৬৪ হাজার ৮৪৪ জন।

এদিকে বাংলাদেশে আক্রান্ত হয়েছেন ১২৩ জন। মৃত্যু হয়েছে ১২ জনের, এর বিপরীতে সেরে উঠেছেন ৩৩ জন।

সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে দিয়ে ক্রমশ বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। করোনার এই মহামারী থেকে বাঁচতে দেশের পর দেশ লকডাউন ঘোষণা করা হচ্ছে। পিছিয়ে নেই বাংলাদেশও। এখানেও জনসামগম-গণপরিবহন এড়িয়ে চলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বন্ধ রয়েছে অফিস-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তৃতীয় দফায় বাড়ানো হয়েছে সাধারণ ছুটি। সামাজিক দূরত্ব ও লকডাউন নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী, পুলিশ রয়েছেন মাঠে। বিকাল ৫টার পর ঔষধের দোকান ব্যতীত সকল দোকানপাট বন্ধের নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।

সর্বশেষ ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে মসজিদ ও অন্যান্য ধর্মালম্বীদের উপসনালয়ে জমায়াতের ব্যাপারেও দেয়া হয়েছে নির্দেশনা। এ নির্দেশনায় সকল ধর্মের ইবাদত-উপাসনা নিজ নিজ ঘরে পালনের জন্য বলা হয়েছে। এক বিজ্ঞপ্তিতে ধর্ম মন্ত্রণালয় জানায়, ওয়াক্তের নামাজে ৫ জন ও জুমার নামাজে ১০ জনের বেশি মসজিদে থাকতে পারবেন না।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়- বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মসজিদ, মন্দির, গীর্জা ও প্যাগোডাসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে জনসমাগমের মাধ্যমে এ রােগের বিস্তার ঘটছে। আমাদের পাশ্ববর্তী দেশগুলােতেও এ ধরনের বিস্তার ও প্রাণহানির ঘটনার উদাহরণ বিদ্যমান। ইতোমধ্যে মুসলিম স্কলারদের অভিমতের ভিত্তিতে পবিত্র মক্কা মুকাররমা ও মদিনা মুনাওয়ারাসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশের মসজিদে মুসল্লিদের আগমন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।

এবার জানা যাক মহামারিতে জামাআত ও জুমার নামাজে ইসলামের দিকনির্দেশনা কীঃ

ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে মহামারি আক্রান্ত অঞ্চলে আজান দেয়া, নামাজের জামাআত অনুষ্ঠিত হওয়া কিংবা জুমআ অনুষ্ঠিত হওয়ার ব্যাপারে করণীয় কী হতে পারে? এ সব ক্ষেত্রে নির্দেশনাই বা কী?

সম্প্রতি করোনার প্রকোপে সর্বপ্রথম কুয়েতের মসজিদে আজানের শব্দ পরিবর্তন করে ঘরে নামাজ পড়ার কথা বলা হয়েছে। তারপর আরব আমিরাত অতপর সৌদি আরবও একই পথ অনুসরণ করেছে।

এ দেশগুলো আজানের ‘হাইয়্যা আলাস-সালহ’ এর পরিবর্তে দুইটি শব্দ ব্যবহার করেছে। কেউ বলেছেন- আসালাতু ফি বুয়ুতিকুম, আবার কেউ বলেছে ‘সাল্লু ফি রিহালিকুম’ শব্দগুলোর অর্থ হলো বাড়িতে অবস্থান করে নামাজ পড়ুন।

কুয়েত কিংবা সৌদির আজানের শব্দে এ পরিবর্তন ইসলাম বিরোধী নয় বরং হাদিসের নির্দেশনারই অনুসরণ।

এ ব্যাপারে হাদিসের নির্দেশনা হলো-
হজরত নাফি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বর্ণনা করেন, প্রচণ্ড এক শীতের রাতে হজরত ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু যাজনান নামক স্থানে আজান দিলেন। অতপর তিনি ঘোষণা করলেন- صَلُّوا فِي رِحَالِكُمْ
‘সাল্লু ফি রিহালিকুম’ অর্থাৎ তোমরা আবাস স্থলেই নামাজ আদায় করে নাও।’

পরে তিনি আমাদের জানালেন যে, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘লাইহি ওয়া সাল্লাম সফরের অবস্থায় বৃষ্টি অথবা তীব্র শীতের রাতে মুয়াজ্জিনকে আজান দিতে বললেন এবং সাথে সাথে এ কথাও ঘোষণা করতে বললেন যে, তোমরা নিজ বাসস্থলে সালাত আদায় কর।’ (বুখারি, মুসলিম, মুসনাদে আহমদ)

এসব হাদিস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়- দুর্যোগের সময় মসজিদে না গিয়ে নিজ আবাসস্থলেই নামাজ আদায়ের ঘোষণা দিয়েছেন স্বয়ং রাসূল (সাঃ)।

সুতরাং বর্তমান মহামারী, ঝড়-বৃষ্টির তুলনায় অনেক বেশী ভয়ঙ্কর ও প্রাণঘাতী। তাই বাসা বাড়িতে স্ত্রী-পুত্র, পরিবার-পরিজনের (মহিলাদের ক্ষেত্রে) সাথে সামনে পেছনে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করা যায়।

আবার দুর্যোগের কারণে মসজিদের জামাতে নামাজ ত্যাগের যেমন অবকাশ আছে তেমনি প্রয়োজনে মসজিদে জুমআ বন্ধ রাখার নির্দেশ আসলেও সেটা পালনে ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে তা অসম্ভব নয়।

আবার হানাফি মাজহাবে জুমআ আদায়ের জন্য যেমন মসজিদ শর্ত নয় আবার বড় জামাআতও শর্ত নয়। ইমাম আবু ইউসুফ রাহমাতুল্লাহি আলাইহির মতে, ইমাম-সহ আরোও ২ জন থাকলেই জুমআ আদায় করা যায়।

সুতরাং করোনায় খারাপ পরিস্থিতির শিকার হলে প্রত্যেকেই যার যার বাড়িতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে জুমআ আদায় করে নিতে পারবেন।

সতর্কতাঃ
মসজিদে নামাজের জামাআত কিংবা জুমআ আদায় নিয়ে এসবই ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখেই বলা। রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘লকডাউন’ কিংবা মসজিদে ব্যাপক উপস্থিতির ব্যাপারে যে দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে তা পালন করাই একান্ত জরুরি।

কেননা, বাংলাদেশে যদি মহামারি করোনা ব্যাপক আকার ধারণ করে কিংরা রাষ্ট্রীয়ভাবে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে কিংবা করোনা প্রতিরোধে মসজিদে জামাআত এবং জুমার নামাজ আদায়ের ব্যাপারে যে নির্দেশনা দেইয়া হয়েছে, তা নিয়ে বিতর্ক না করে সরকারের সিদ্ধান্তে সহযোগিতা করাই হবে কল্যাণকর কাজ। আর তা হবে হাদিসের দিক-নির্দেশনারও অনুসরণ।

তাছাড়া মহামারি করোনা যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় আর তা চীন, ইতালি, স্পেন, ইরান, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্রে মতো অবস্থায় গিয়ে দাঁড়ায় তবে তা নিয়ন্ত্রণ করা যেমন দুষ্কর হয়ে যাবে আর তখন সতর্কতা অবলম্বনও কোনো কাজে আসবে না।

সুতরাং আজানের শব্দ পরিবর্তন, মসজিদে জামাআত এবং জুমআ নিয়ে অযথা তর্ক-বিতর্ক নয় বরং মহামারি করোনায় রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত যথাযথ মেনে জনসমাগম এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ। আর বেশি বেশি আল্লাহমুখী হওয়া, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং পাপাচার ও অন্যায় বন্ধ করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসাই মুমিন মুসলমানের একান্ত করণীয় কাজ।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে করোনা প্রতিরোধে রাষ্ট্রীয় সব সিদ্ধান্তের আলোকে ইসলামের নির্দেশনাগুলো যথাযথ পালনের মাধ্যমে মহামারি থেকে মুক্ত থাকার তাওফিক দান করুন, আমিন।

শেয়ার করুনঃ