বিশ্বজুড়ে দেশে দেশে যখন করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে চলছিল, তখনো আমরা ছিলাম নির্লিপ্ত। বিদেশের সাথে সব রকম যোগাযোগ রেখে সরকার দেশে আসা প্রবাসীদের সতর্কতার উপর জোর দিয়ে রোগ মুক্ত থাকার পথ বেছে নেয়। হোম কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশন এর মত শব্দগুলো যেমন নতুন তেমনি মজার বিষয় মনে হচ্ছিল! কৌতূহলী জাতি আমরা।

প্রবাসীদের দ্বারা সংক্রমণ হতে পারে জেনে আইন অমান্যকারী কিছু সংখ্যক প্রবাসীদের আপনি সচেতনতার পরামর্শ পৌঁছে দিতে যাননি। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, দোকানের দরজায় অপমানজনক বক্তব্য লিখে বাহাদুরি দেখিয়েছেন। সেই আপনাকে যখন সংক্রমণ রোধের লক্ষ্যে সরকার ছুটি দিয়ে ঘরে থাকার নির্দেশ দিল তখন আপনি হলিডে মোডে রওয়ানা দিতে গেলেন দূর পাল্লার বাস, ট্রেন আর লঞ্চে গাদাগাদি করে। তখন আপনার তাত্ত্বিক জ্ঞান শিকেয় তুলে রাখলেন। করোনা রোধে আপনার ভূমিকা এখন নিজের উপর নিতে নারাজ। যেই দোকানদার প্রবাসীদের প্রবেশ নিষেধ সাইনবোর্ড টাংগিয়েছিলেন পরবর্তীতে তিনি সরকারের নির্দেশ অমান্য করে করোনার সংক্রমণে সহায়তা করছিলেন তা মানতে নারাজ। আর কিছু ধর্মপ্রাণ বকধার্মিক যেভাবে সচেতনতা মেনে চলা মানুষদের শিক্ষা দেবার জন্য চেষ্টা চালিয়েছেন তারা যে জনজীবনকে কতটুকু বিপাকে ফেলতে পারেন তার জ্ঞান তাদের যদি থাকতো।

যাই হোক সরকার লকডাউন দেয়না কেন? আপনার প্রশ্নের জবাবে সরকার লকডাউন দিল। কিন্তু আপনি আমি ঘরে থাকলে চলে না, গলির মোড়ে আড্ডা দিতে না পারলে রাতের ঘুম হয়না, মেহনতি মানুষ ঘরে বসে থাকলে খাবে কি, মসজিদ মন্দিরে না গেলে স্র’ষ্টার সুদৃ’ষ্টি পাবেন কিভাবে হাজার হাজার অজুহাতে লক ডাউন উঠিয়ে নিল সরকার।

আপনি স্বাধীন, আমি স্বাধীন আবার। সবটাই কি সরকার আর প্রশাসনের উপর নির্ভর? আপনার আমার বিবেক বিবেচনা কাজে লাগাবো কবে?

স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করে গলির আড্ডা চালু হলো, চায়ের দোকানের আড্ডা ফিরে এলো, ইফতারির ঐতিহ্য বহাল থাকলো, ঈদের আমেজে শপিং হচ্ছে। একটি বছর, অন্তত একটি মাস আমরা ধৈর্য্য ধরে থাকতে পারছি না। এই উৎসবের ভয়াবহতা কত ভয়ানক হতে পারে এই ভাবনা ভাবার সময় আমাদের নেই।

এই মহামারি আমাদের দেশে ছড়ানোর প্রথম দিক থেকে মানুষের উদাসীনতা দেখে প্রায়ই বলতাম,
“বাঙ্গালী না দেখে বিশ্বাস করবে না আর দেখার পর বাঁধ দিয়ে আটকাতে পারবে না। ”

আমরা দেখেছি ইতিমধ্যে, দেখেও সতর্ক না।

আমাদের এই অসতর্কতা কতটুকু এলার্মিং হতে পারে তার একটি ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ তুলে ধরার চেষ্টা করি। এর বিজ্ঞানসম্মত কোনো ভিত্তি নাও থাকতে পারে।

তা প্রমাণের জন্য ইউরোপের একটি দেশের সার্বিক অবস্থার সাথে একটু আমাদের দেশের সাথে তুলনা করে দেখি। ফ্রান্সকে এ হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে দেখি।

একটু ফ্রান্স আর বাংলাদেশের আয়তনের দিকে তাকাই। স্ট্যাটাসে সংযুক্ত ছবির প্রা’প্ত তথ্যের দিকে থাকালে বুঝা যায় ফ্রান্স আয়তনের দিক থেকে বাংলাদেশর চেয়ে তিনগুণ বড়। আর জনসংখ্যার হিসেবে বাংলাদেশের জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশের কাছাকাছি। যেকোনো রোগ সংক্রমণের জন্য জনবসতির অনুপাত অন্যতম নির্ধারক হলে বাংলাদেশের সে সুযোগ ফ্রান্সের তুলনায় ছয়গুণ বেশি হবার কথা।
বিদ্যমান রোগ নিরীক্ষণ ও স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা বিবেচনা করলেও বাংলাদেশ ফ্রান্সের থেকে কত ধাপ পিছনে পড়ে আছে সেটা চিন্তার বিষয়।

তাদের জনগণের সাধারণ খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্য সচেতনতার দিক দিয়েও আমাদের থেকে অনেক এগিয়ে বলে আমি মনে করি।

আমাদের থেকে ফ্রান্স এর করোনা ভাইরাস সং’ক্রমণ সম্ভাবনা ঝুঁকি বেশি হওয়ার একটি কারণ হতে পারে পুরো ইউরোপের সাথে তাদের ফ্রি মুভমেন্ট। এছাড়া আর কোন দিক দিয়ে আমরা করোনা ভাইরাস রোধে তাদের থেকে এগিয়ে থাকতে পারি?

আর হাস্যরসাত্মকভাবে এখন যেটি প্রচার পাচ্ছে, বাংলাদেশের মানুষ যেভাবে হাজার প্রতিকূল পরিবেশের সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে আছে তাতে করোনা ভাইরাস তাদের কাবু করতে বেগ পাচ্ছে! সেটাও মেনে নেই আমাদের তাদের থেকে এক পয়েন্ট এগিয়ে রাখছে।

তারপর চোখ রাখি দুই দেশের ১৮ তারিখের করোনা আপডেটের দিকে (উদাহরণ স্বরুপ)।

বাংলাদেশের শুধু আক্রা’ন্তের হিসেবের চেয়ে ফ্রান্সের করোনায় আক্রা’ন্ত হয়ে মোট মৃ’তের সংখ্যা বেশি। আমাদের দেশের মৃ’তের সংখ্যা এখনো চারশত পেরোয়নি। আর ফ্রান্সে কিছু কিছু সময় একদিনে পাঁচশোরও অধিক করে লোক মারা গেছে।

বিভিন্ন সূচকে এতো এগিয়ে থেকেও যদি তাদের মৃ’ত্যুর মিছিল এতো দীর্ঘ হয়, আমাদের এ অবস্থা হতে কতক্ষণ লাগবে? হয়তো স্র’ষ্টার উপর অতিরিক্ত ভরসার কারণে আমাদের উপর এখনো এতো চেপে বসেনি। কিন্তু আমাদের এতো অবহেলা, খামখেয়ালিপনা দেখেও স্র’ষ্টা আর কতদিন আমাদের ফেভার করবেন?

আমাদের এবারের ঈদ উৎসব পালনের জন্য যে শপিং মলের ভীড় বিদ্যমান তাতো অশনি সংকেত। আর ঈদে ঘরমুখো মানুষগুলো ঈদ বাজারের সাথে দেশজুড়ে আর কোন কোন উপহার ছড়িয়ে দেবেন সেটাও ভাবার বিষয়।

ইতিমধ্যে আমাদের দেশে করোনার বিস্তার প্রতি উপজেলা পর্যায়ে হয়ে গেছে।

এখনো করোনা ভাইরাস আক্রা’ন্ত রোগীদের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই। তারপরও বিশ্বজুড়ে আক্রা’ন্ত রোগীদের মাঝে দেখা যাচ্ছে আশি ভাগ রোগী সুস্থ হচ্ছেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা যেটা বলছেন, এই রোগ থেকে সেরে উঠার মূল নির্ধারক হচ্ছে রোগীর শরীরের বিদ্যমান রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। আর এটা সহজেই অনুমান করা যায়, বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানুষের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমতে থাকে(অন্য অসুখ বিসুখ শরীরে থাকলে কম বয়সেও হতে পারে)। এর প্রমাণ মেলে বিগত ১২ এপ্রিলে পর্তুগাল সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের প্রদত্ত বয়স ভিত্তিক করোনা আক্রা’ন্ত মৃ’তদের তালিকা থেকে।

আশি বছর বয়সের উপর মৃতের সংখ্যা ৭৬৯ জন
৭০ থেকে ৮০ বছর বয়সের মৃতের সংখ্যা ২২৮ জন
৬০ থেকে ৬৯ বছর বয়সের মৃতের সংখ্যা ৯৯ জন
৫০ থেকে ৫৯ বছর বয়সের মৃতের সংখ্যা ৩৬ জন
৪০ থেকে ৪৯ বছর বয়সের মৃতের সংখ্যা ১১ জন
৩০ থেকে ৩৯ বছর বয়সের মৃতের সংখ্যা ০০ জন
২০ থেকে ২৯ বছর বয়সের মৃতের সংখ্যা ০১ জন

আমার ব্যক্তিগত অভিমত, একজন শক্ত সামর্থ্য ব্যক্তি শরীরে এই ভাইরাস বহন করলেও তার ক্ষেত্রে উপসর্গগুলো প্রকাশ নাও হতে পারে। তার অজ্ঞাতসারে তিনি অসুখে ভোগে সুস্থও হয়ে যেতে পারেন। কিন্তু এমন হতে পারে তার সংস্পর্শে এসে অন্য একজন চরম ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। তাই আমার পাশের দৃশ্যমান সুস্থ মানুষটিও আমার জন্য নিরাপদ বলে মনে করা উচিত হবে কি?

এখনো কি আমরা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ পন্থাগুলো নিজ দায়িত্বে মেনে চলার সময় আসেনি? আপনি আমি না পারলে রাস্ট্র আমাদের বাধ্য করে নিরাপত্তা দিতে পারবে না। আর আমার বেপরোয়া চলাচলের দ্বারা অন্য কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হবার আগে আমি নিজে ও আমার আপনজনেরা ক্ষতিগ্রস্ত হবার সম্ভাবনা বেশি।

এখন ভাবার বিষয় হচ্ছে, স্র’ষ্টা কি আমাকে আমার ঘরের বয়োজ্যেষ্ঠ ও শারীরিকভাবে দূর্বল মানুষদের জীবন বিপন্ন করার অধিকার দিয়েছেন?

শেয়ার করুনঃ