মোঃ আব্দুল মুনিম জাহেদী ক্যারল:

করোনাভাইরাসকে বিশ্বব্যাপী মহামারি হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন সংক্রামক রোগ ও মহামারী নতুন কিছু নয়, এমন সংক্রামক রোগের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ।বিষাক্ত মহামারী ভাইরাস বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নামে আবির্ভাব হয়েছে এই নশ্বর পৃথিবীতে। পৃথিবীতে যুগে যুগে অসংখ্য মহামারীর ঘটনা ঘটেছে, একইরকম ভয়াল সংক্রামক রোগের মহামারি হানা দিয়েছে বহুবার, মৃত্যু হয়েছে কোটি কোটি মানুষের। আজ থেকে ১০ হাজার বছর আগে মানুষ যখন কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে থিতু হয়, তখনই মূলত গোষ্ঠী বা সম্প্রদায় তৈরির ধারণা আরও পোক্ত হয়। আর সেই সময় থেকেই সংক্রামক রোগ মহামারিতে রূপ নিতে শুরু করে। ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা, কুষ্ঠ, ইনফ্লুয়েঞ্জা, গুটিবসন্ত প্রভৃতি বিভিন্ন রোগ নানা সময়ে মহামারির আকার নিয়েছে। ইতিহাসে অর্ধশতাধিক মহামারীর লিখিত তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়। মহামারীগুলোতে মানব জাতি বিভিন্ন সময়ে বড় সংকটে পড়েছিল।

ইসলামের ইতিহাস থেকে অনেকগুলি মহামারীর ঘটনা জানা যায়, যেমন হজরত মুছা (আ:) এর সময়ে তাঁর দেশের খাদ্য শস্য নষ্ট হতে লাগলো এবং ক্ষেত খামার রৌদ্র জ্বলে শুকিয়ে গেলো, প্রচন্ড দুর্বিক্ষে মানুষ জমাকৃত ফসল খেয়ে শেষ করে গাছ বৃক্ষের পাতা শিকড়, অখাদ্য কুখাদ্য খেয়ে মহামারীর সম্মুখীন হলো। দেশের মানুষ দুর্ভিক্ষ ও মহামারী দুটি বিপদের সুম্মোখিন হলো। ঘরে বাইরে, রাস্তা ঘাটে মানুষের লাশ পড়ে থাকলো। জীবিত মানুষ পিতা মাতা, ভাই বোন, আত্নীয় স্বজন ছেড়ে, নিজের দেশ ছেড়ে অন্য দেশে পালিয়ে গেলো। কবিড-১৯ মহামারি করোনা ভাইরাস ভয়াবহ আক্রমণের ভয়ে যেমন মানুষ নিজের মাতা পিতার লাশের পাশে যাচ্ছে না, ঠিক এমন পরিস্তিতি হয়েছিল ঐ সময়ে।

দ্বিতীয়বার সারা রাষ্টে উকুনের উপদ্রপ হলো, নারী পুরুষ উকুনের আক্রমে রক্ত শুন্যতায় বিষম কষ্টে মারা যেতে লাগলো, উকুনের সংখ্যা দিন দিন বাড়তে লাগলো এবং এক পর্যায়ে উকুন গুলো বড় হয়ে কচ্ছপের আকার ধারণ করলো। ঐ মহামারীর কারণে রাষ্টের এক তৃতীয়ংশ মানুষ মৃত্যু বরণ করে, পরে হজরত মুছা (আ:) দোয়ার বরকতে আল্লাহ তায়ালা পাহাড়ের পূর্ব দিক থেকে বাতাস প্রবাহ করে দুদিনের ভিতর সব উকুন নিঃশেষ করে মানুষকে এই মহাবিপদ থেকে রক্ষা করেন। এইরকম বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নবীর আমলে নানা রকম মহামারীর আক্রমণে গুষ্টি, সম্প্রদায়সহ হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারায়, ধ্বংস হয় কত জাতি !

আমাদের নবী হজরত মোহাম্মদ রসূলুল্লাহ (সা.) এর সময়ে কুষ্ঠ রোগের ঘটনা ঘটেছিল। বোখারী শরীফের বরাতে বলা হয়েছে, তিনি বলেছেন, ‘কুষ্ঠ রোগীর কাছ থেকে এমনভাবে পলায়ন কর, যেভাবে তোমরা বাঘ হতে পলায়ন কর।’ ইবনে মাজা’র হাদিসে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ (সা.) একজন কুষ্ঠ রোগীর হাত ধরে একটি দোয়া পাঠ করে তাকে খাবারে শরিক করেন। কুষ্ঠ ও শেতি (ধবল) রোগ সম্পর্কে হজরত ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেন, এটি এবং ধবল উভয় সংক্রামক বা ‘ছোয়াঁচে’ রোগ।

কোভিড-১৯ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিটি দেশের মানুষকে তাই কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। ইসলামিক স্কলারদের দাবি হলো- কোয়ারেন্টাইন পদ্ধতিটি মহামারীর বিস্তার রোধে প্রিয়নবী (সা.)-এর একটি নির্দেশনা। এ পন্থার সর্বপ্রথম প্রয়োগ ছিল ওমর (রা.)-এর যুগে। তাই বলা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে বহুল আলোচিত এই পদ্ধতির নির্দেশনা দিয়েছেন বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.)।

মহানবী (সা.)-এর নির্দেশনা মতে, কেউ যেন আক্রান্ত অঞ্চলে প্রবেশ না করে এবং সেখান থেকে বের হবে না। বরং সেখান থেকে বের হওয়াকে রণাঙ্গন থেকে পলায়নের মতো বলা হয়েছে; যা কবিরা গোনাহের শামিল। তেমনি মহামারীতে ধৈর্যধারণকারীদের জন্য থাকবে শহীদের মতো সওয়াব।

ফিলিস্তিনের আল-কুদস ও রামলার মধ্যভাগে অবস্থিত একটি অঞ্চল হলো আমওয়াস বা ইমওয়াস। সেখানে প্লেগ রোগ প্রথম প্রকাশ পায়। অতঃপর তা সিরিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। ইসলামের ইতিহাসে তা ‘তাউন আমওয়াস’ নামে পরিচিত। ১৯৬৭ সালে ইসরায়েল আমওয়াস অঞ্চল পুরোপুরি ধ্বংস করে ওই স্থানে কানাডাভিত্তিক ইহুদি তহবিলের অর্থায়নে একটি পার্ক তৈরি করা হয়। বর্তমানে তা ‘কানাডা পার্ক’ নামে পরিচিত।

ইসলামের ইতিহাস থেকে আমরা জানি হজরত নুহ (আ.) এর সময়ের তাঁর সমাজ ও রাষ্ট্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা তাঁর কথায় কর্ণপাত করেনি। নুহ (আ.) তাদের আল্লাহর শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করেন। তবু তাদের সতর্ক হয়নি। অবশেষে আল্লাহর আজাব আসে। এক ভয়ংকর প্লাবন ও জলোচ্ছ্বাস তাঁর জাতির অবাধ্য লোকদের ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এমন প্লাবন সেই জাতিকে গ্রাস করেছিল, যেই প্লাবন হাজার বছর ধরে পৃথিবীতে ইতিহাস হয়ে আছে। তখন নুহ (আ.)-এর নৌকায় যারা আশ্রয় নিয়েছিল তারাই রক্ষা পেয়েছিল। আল্লাহ বলেন, ‘আমি তার (নুহের) বংশধরদের অবশিষ্ট রেখেছি বংশপরম্পরায়।’ (সুরা : সাফফাত, আয়াত : ৭৭)

আদ-এর অমার্জনীয় পাপের ফলে প্রাথমিক গজব হিসাবে তিন বছর বৃষ্টিপাত বন্ধ থাকে। তাদের শস্যক্ষেত সমূহ শুষ্ক বালুকাময় মরুভূমিতে পরিণত হয়। বাগ-বাগিচা জ্বলে-পুড়ে যায়। এতেও তারা অমার্জনীয় পাপ ত্যাগ করেনি। কিন্তু অবশেষে তারা বাধ্য হয়ে আল্লাহর কাছে বৃষ্টি প্রার্থনা করে। তখন আসমানে সাদা, কালো ও লাল মেঘ দেখা দেয় এবং গায়েবী আওয়ায আসে যে, “তোমরা কোনটি পছন্দ করো?” লোকেরা বলল কালো মেঘ। তখন কালো মেঘ এলো। লোকেরা তাকে স্বাগত জানিয়ে বলল, “এটি আমাদের বৃষ্টি দেবে”। জবাবে বলা হয়, বরং এটা সেই বস্তু, যা তোমরা তাড়াতাড়ি চেয়েছিলে। এটা বায়ু এতে রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি। তার পালনকর্তার আদেশে সে সব কিছুকে ধ্বংস করে দেবে। ফলে অবশেষে পরদিন ভোরে আল্লাহর চূড়ান্ত গজব নেমে আসে। সাত রাত্রি ও আট দিন ব্যাপী অনবরত ঝড়-তুফান বইতে থাকে। মেঘের বিকট গর্জন ও বজ্রাঘাতে বাড়ী-ঘর সব ধ্বসে যায়, প্রবল ঘুর্ণিঝড়ে গাছ-পালা সব উপড়ে যায়, মানুষ ও জীবজন্তু শূন্যে উত্থিত হয়ে সজোরে যমীনে পতিত হয়।

ইতিহাস থেকে আমরা জানি, ১৬৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮০ খ্রিস্টাব্দে রোমে স্মল পক্স মহামারীতে বহু মানুষ মারা যায়, রাজপরিবারের সদস্যরাও এর আক্রমণ থেকে বাঁচেনি। বিখ্যাত রোমান সম্রাট মার্কাস অরেলিয়াসের ভাই লুইসিয়াস ভেরাসের মারা গিয়েছিলেন। ২৫০ খ্রিস্টাব্দে সাইপ্রিয়ানের প্লেগ মহামারী রোমান সাম্রাজ্যকে দুর্বল করে দেয়। এর পর, পঞ্চম শতাব্দীতে একদিকে যুদ্ধ অন্যদিকে এই মহামারী পরাক্রমশালী পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যকেই শেষ করে দেয়। আবার ষষ্ঠ শতাব্দীর প্রথমভাবে সালে রোমান সাম্রাজ্যেও পূর্ব অংশের সম্রাট জাস্টিনিয়ান ওয়ান, রোমান সাম্রাজ্যকে আবার আগের মত প্রতাপশালী অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা করেন, বিউবনিক প্লেগ মহামারীতে তাঁর মৃত্যু সেই সম্ভাবনাকেও শেষ করে দেয়। পরবর্তী দুই শতাব্দীতে বিউবনিক প্লেগে প্রায় ৫ কোটি মানুষ মারা যায়, যা তৎকালীন জনসংখ্যার ২৬ শতাংশ।

দ্য প্লেগ অব এথেন্স, খ্রিস্টপূর্ব ৪৩০ অব্দের কথা। স্পার্টানদের সাথে গ্রিকদের তখন যুদ্ধ চলছে। যুদ্ধে এমনিতেই খুব একটা সুবিধা করে উঠতে পারছিল না গ্রিকরা। তার উপর মরার উপর খরার ঘা হয়ে আসে ‘দ্য প্লেগ অব এথেন্স’ নামে পরিচিত পৃথিবীর প্রথম প্লেগ মহামারী। এই মহামারীতে হাজার হাজার গ্রিক সৈন্য মারা যায় কয়েক দিনের ব্যবধানে।

এরপর ৫৪১ খ্রিস্টাব্দে আসে ইতিহাসের আরেক ভয়াবহ মহামারি। এর নাম ‘জাস্টিনিয়ান প্লেগ’। মহামারির নামকরণ হয় তখনকার রোমান সম্রাট জাস্টিনিয়ানের নামানুসারে। এ মহামারির জীবাণু ছিল ‘Yersinia Pestis’ নামক ব্যাকটেরিয়া; যা ইঁদুর ও একধরণের মাছির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র ভুমধ্যসাগরীয় অঞ্চলসহ রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী কন্সট্যান্টিনোপলে।

১৩৩৪ সালে চীনে দেখা দেয় ‘বিউবনিক প্লেগ’ যা ইতিহাসে ‘ব্ল্যাক ডেথ’ হিসেবে পরিচিত। এ মহামারির জীবাণুও ছিল ‘Yersinia Pestis’ নামক ব্যাকটেরিয়া যা ইঁদুর ও একধরণের মাছির মাধ্যমে ছড়িয়ে ছিল। উপসর্গ ছিল জ্বর, বিষফোঁড়া, রক্তবমি ও নিউমোনিয়া। সংক্রমিত মানুষের প্রায় ৫০ শতাংশই মারা গিয়েছিল।

দ্য ব্ল্যাক ডেথ, পৃথিবীর ইতিহাসে ব্ল্যাক ডেথের মতো আলোচিত মহামারী আর কখনো হয়নি। এরকম ভয়ানক, সর্বগ্রাসী রোগের প্রাদুর্ভাব সম্ভবত পৃথিবী সেই একবারই দেখেছিল ১৪ শতকে। কৃষ্ণ সাগরের (ব্ল্যাক সি) উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলো থেকে এই রোগ ছড়িয়ে পড়েছিল বিধায় একে ব্ল্যাক ডেথ বলা হয়। সেসময় ইউরোপ ও এশিয়ার বাণিজ্য হতো এই কৃষ্ণ সাগর দিয়েই। আর এখান থেকে খাদ্যদ্রব্যের জাহাজগুলোতে চড়ে বসতো অসংখ্য ইঁদুর, যেগুলো কি না রোগের প্রধান জীবাণুবাহী। ব্ল্যাক ডেথের সময় মানুষ কোন রোগটিতে মানুষ অধিক হারে মৃত্যুবরণ করেছিল তা নিয়ে ইতিহাসবিদগণ দ্বিধাবিভক্ত। এক অংশের মতে, রোগটি ছিল একপ্রকার গ্রন্থিপ্রদাহজনিত প্লেগ। অন্য অংশের দাবি এই ভয়ানক মহামারী ঘটেছিল ইবোলা ভাইরাসের কারণে। ব্ল্যাক ডেথে মৃত্যু হয়েছিল শত শত মানুষের, ১৩৪৭-৫১ খ্রিস্টাব্দ সময়কালই ছিল ব্ল্যাক ডেথের সবচেয়ে বিধ্বংসী সময়। এ সময় ইউরোপের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয় এই মহামারী। তবে এই অভিশপ্ত মহামারীর প্রভাব টিকে ছিল অন্তত ২০০ বছর। ইতিহাসবিদগণের মতে, এ ২০০ বছরে অন্তত ১০ কোটি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন! এটি এমনই এক মহামারী ছিল যে, এর কারণে সমগ্র ইউরোপের অর্থনৈতিক সার্বিক জীবন কাঠামোই বদলে যায়, প্রভাবিত হয় শিল্প সাহিত্যও। ব্ল্যাক ডেথের রেখে যাওয়া গভীর ক্ষত বয়ে বেড়াতে হয় পরবর্তী বেশ কয়েক প্রজন্মের।

স্মলপক্স এপিডেমিক অব মেক্সিকোবর্তমান মেক্সিকোতে ১৫১৯ সালে স্মলপক্স ছড়িয়ে পড়লে দুই বছরে মারা যায় প্রায় ৮০ লাখ মানুষ।

স্মলপক্স এপিডেমিক অব আমেরিকাফ্রান্স, গ্রেট বৃটেন ও নেদারল্যান্ডসবাসীর মাধ্যমে ১৬৩৩ সালে আমেরিকার ম্যাসাচুসেটসে স্মলপক্স ছড়িয়ে পড়ে। এতে প্রায় ২ কোটি মানুষ মারা যায় বলে দাবি করেন ইতিহাসবিদরা।

ইয়েলো ফিভার এপিডেমিক অব আমেরিকাআমেরিকার ফিলাডেলফিয়ায় ১৭৯৩ সালে ইয়েলো ফিভার মহামারী আকার ধারণ করে। এতে নগরের ১০ ভাগের এক ভাগ, প্রায় ৪৫ হাজার মানুষ মারা যায়।

১৯১৮ সালের শেষের দিকে ভয়ঙ্কর এক মহামারি সারা বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। ওই মহামারির নাম ছিল স্প্যানিশ ইনফ্লুয়েঞ্জা। মানব ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী এই ফ্লুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছিল পাঁচ কোটিরও বেশি মানুষের। এই সংখ্যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নিহত মানুষের সংখ্যার চাইতেও বেশি।সেসময় সারা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক চতুর্থাংশেরই মৃত্যু হয়েছিল এই ভাইরাসে। বছরের অধিক কাল বিস্তৃত প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যেখানে ২ কোটির মতো মানুষ প্রাণ হারায়, সেখানে মাত্র এক বছরেই ইনফ্লুয়েঞ্জা প্যানডেমিক কেড়ে নেয় ১ কোটির বেশি মানুষের প্রাণ!

দ্য পোলিও এপিডেমিক, ১৯১৬ সালে পোলিও রোগ প্রথম মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে। সেবছর নিউইয়র্কে ৯ হাজার মানুষ পোলিওতে আক্রান্ত হয় যার মধ্যে ৬ হাজার মানুষই মৃত্যুবরণ করে! চিকিৎসাবিজ্ঞান তখন যথেষ্টই উন্নত হলেও চিন্তার বিষয় ছিল যে, এই মহামারীতে মৃত্যুর হার আগের যেকোনো মহামারীর চেয়ে বেশি ছিল! নিউইয়র্ক শহর থেকে ক্রমে পোলিওর প্রাদুর্ভাব বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৫০ সালে জোনাস সাল্ক পোলিও টিকা আবিষ্কার করলে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ কমে যায়।

১৯৭০ সালে ভারতে হঠাৎ মহামারী আকারে ছড়িয়ে যায় গুটি বসন্ত। ১ লক্ষাধিক মানুষ রাতারাতি এ রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। এক বছরেই মৃত্যুবরণ করে ২০ হাজারের অধিক মানুষ। যদিও এ তালিকার অন্যান্য মহামারীর তুলনায় এ মৃত্যুর সংখ্যাটা বেশ কম, তথাপি চিকিৎসাবিজ্ঞানের আধুনিক সময়ে, যখন বিশ্ব প্রায় গুটি বসন্ত মুক্ত হয়ে গেছে, তখন ভারতের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে এরূপ মহামারী ছিল বেশ হতাশাজনক। পরবর্তী কয়েকবছরে ভারত সরকার এবং জাতিসংঘের সহায়তায় গঠিত একটি স্বাস্থ্য বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠনের আন্তরিক প্রচেষ্টায় ১৯৭৫ সালেই ভারতকে গুটি বসন্ত মুক্ত ঘোষণা করা হয়।

দ্য থার্ড প্লেগ প্যানডেমিক, ইতিহাসে বিস্তৃত আকারে প্লেগের প্রাদুর্ভাব ঘটে ৩ বার। তৃতীয়টির উৎপত্তি ১৯ শতকে চীনে, যখন বিশ্ববাণিজ্যে ভালোরকম প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে দেশটি। ইউয়ান নামক একটি ছোট্ট গ্রামে প্রথম এর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। ক্রমে তা বিস্তার লাভ করতে করতে হংকং আর গুয়াংঝু প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে, যে শহরগুলোর সাথে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরাসরি বাণিজ্য সম্পর্ক ছিল। ফলে প্লেগ ছড়িয়ে যায় ভারত, আফ্রিকা, ইকুয়েডর, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও। প্রায় দুই দশক স্থায়ী এ মহামারীতে প্রাণ হারায় ১ কোটির অধিক মানুষ।

ইবোলা: ভয়াবহ ইবোলা ভাইরাসে মৃত্যু হার ৫০ শতাংশের মতো। ২০১৪ ও ২০১৬ সালের মধ্য আফ্রিকায় বড় প্রাদুর্ভাবে অন্তত ১১ হাজার মানুষ মারা গেছে। ইবোলা ভাইরাসে সংক্রমিত হলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মৃত্যুই অবধারিত।

সার্স ও মার্স : ২০০২ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে দুবার এর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। আট হাজারের বেশি আক্রান্তের মধ্যে ৭৭৪ জনের মৃত্যু হয়। ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হলে ভয়াবহ শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। এরকম আরেকটি ভাইরাস হচ্ছে মার্স।

ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস অর্থোমিক্সোভিরিডি ফ্যামিলির একটি ভাইরাস, যা ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগের জন্য দায়ী। বিভিন্ন সময়ে এটা লাখ লাখ মানুষের মৃত্যুর কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে এসেছে। ১৯১৮ থেকে ১৯১৯ সাল সময়ে ইনফ্লুয়েঞ্জাতে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৫ কোটি মানুষ মারা যায়।

এইচআইভি ভাইরাসপ্রথম এইচআইভি ভাইরাস শনাক্ত হয় ১৯৮৪ সালে। এ ভাইরাসের কারণে এইডস রোগে সে বছরই আমেরিকায় মারা যায় ৫,৫০০ জন। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ৩৫ মিলিয়ন মানুষ এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত। আর এ পর্যন্ত এইডসে মারা গেছে আড়াই কোটির বেশি মানুষ।

পৃথিবীর ইতিহাসে যুগে যুগে এর আগে যেসব রোগ মহামারী রূপ নিয়েছিল মূলত সেই সব মহামারী নিয়ে আজকের লিখনি।
সার্স এপিডেমিক‘সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম’ তথা সার্স নামটি মহামারীর তালিকায় নতুন এবং আমাদের কাছে খুব পরিচিত। হাঁচি-কাশির মাধ্যমে বায়ুবাহিত এ রোগের জীবাণু সহজেই ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম বলে জনমনে সংক্রমণের আশঙ্কাটা ছিল বেশি। এশিয়ার সামান্য কিছু অংশসহ ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় সার্স ছড়িয়ে পড়ে। সার্সের জীবাণু দেহে প্রবেশ করলে প্রাথমিকভাবে মাথাব্যথা, জ্বর থেকে এক সপ্তাহের মধ্যে শুষ্ক কাশি শুরু হয়, যা একসময় নিউমোনিয়ায় পরিণত হয়। সার্সের কোনো নিজস্ব চিকিৎসা নেই। তাই ডাক্তাররা এর প্রতিকার থেকে প্রতিরোধে বেশি গুরুত্ব দেন, যে কারণে ২০০৩ সালে সার্সের প্রাদুর্ভাবের সময় সার্জিক্যাল মাস্ক ব্যবহার বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। সমগ্র উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপ এবং এশিয়ার কয়েকটি দেশে কয়েক লক্ষাধিক মানুষ সার্স দ্বারা আক্রান্ত হয়। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান দ্রুত কাজ শুরু করলে মৃতের সংখ্যা বাড়তে পারেনি। মাত্র ৬ মাসের মধ্যেই বিশ্বব্যাপী সার্স নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। এসময় এ রোগে মৃত্যু হয় ৭৩৭ জনের।

সোয়াইন ফ্লু এপিডেমিকবিশ্বজুড়ে ২০০৯ সালে সোয়াইন ফ্লু বা এইচ ওয়ান এন ওয়ান ফ্লুতে ১৮,৫০০ জন মারা গেছে বলে নিশ্চিত হওয়া যায়। তবে এ রোগে মৃত্যুর সংখ্যা ৫ লাখ ৭৫ হাজার বলেও ধারণা করা হয়।

কলেরা এপিডেমিক অব হাইতিহাইতিতে ২০১০ সালে ভয়ঙ্কর এক ভূমিকম্পের পর কলেরা মহামারী রূপ নিলে ১০ হাজার মানুষ মারা যায়।

বিশ্বজুড়ে ২০১২ সালে ভাইরাসজনিত রোগ হামে মারা যায় ১ লাখ ২২ হাজার মানুষ। সে বছর পুরো বিশ্বে ব্যাকটেরিয়া সংক্রামক রোগ টিউবারকিউলোসিসে মারা যায় ১.৩ মিলিয়ন মানুষ। এছাড়া প্রতিবছর টাইফয়েড জ্বরে মারা যাচ্ছে ২ লাখ ১৬ হাজার মানুষ।

ইবোলা এপিডেমিকপশ্চিম আফ্রিকায় ২০১৪ সালে ইবোলা জ্বরে মারা যায় অন্তত ১১,৩০০ জন।

কোভিড-১৯ মহামারি, সম্প্রতি চীন থেকে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে বিষাক্ত ভাইরাস ‘করোনা’। যে ভাইরাসের সাথে কিছুদিন আগেও মানুষ পরিচিত ছিলো না। কারণ, এই ভাইরাস এর আগে কখনো মানুষের মধ্যে দেখা যায়নি। তবে ২০০২ সালে চীনে সার্স (সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম) নামের একটি ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছিল, যাতে সংক্রমিত হয়েছিল ৮ হাজার ৯৮ জন। মারা গিয়েছিল ৭৭৪ জন। সেটিও ছিল এক ধরনের করোনাভাইরাস। যার লক্ষণগুলো হলো- কাশি, জ্বর, শ্বাস-কষ্ট, নিউমোনিয়া।

কোভিড-১৯ প্যানডেমিক এখনো পর্যন্ত চলমান এই ভাইরাস যা মানুষের ফুসফুসের মারাত্মক রোগ সৃষ্টি করে- যা পূর্বে বিজ্ঞানীদের অজানা ছিল, রেসপিরেটরি লক্ষণ ছাড়াও জ্বর, কাশি, শ্বাস প্রশ্বাসের সমস্যাই মূলত প্রধান লক্ষণ।এটি ফুসফুসে আক্রমণ করে। সাধারণত শুষ্ক কাশি ও জ্বরের মাধ্যমেই শুরু হয় উপসর্গ, পরে শ্বাস প্রশ্বাসে সমস্যা দেখা দেয়। এ প্যানডেমিকে নতুন একটি ইতিহাস সৃষ্টি করেছে, ২০১৯ সালে এশিয়ার কয়েকটি দেশে এডিস মশা বাহিত রোগ ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ে। ফিলিপাইনে প্রায় ৭২০ জন ডেঙ্গুতে মারা যান। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ায়ও ছড়িয়ে পড়েছিল ডেঙ্গু। বাংলাদেশেও ভয়াবহ অবস্থা দাঁড়িয়েছিল। ২০২০ সালে এসে করোনাভাইরাস ঘটিত কোভিড-১৯ কে প্যান্ডেমিক ঘোষণা করা হয়েছে। রোগটির প্রাদুর্ভাব প্রথমে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে চীনের হুপেই প্রদেশের উহান নগরীতে শনাক্ত করা হয়। ২০২০ সালের ১১ই মার্চ তারিখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা রোগটিকে একটি বৈশ্বিক মহামারী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।২০২০ সালের ৫ জুন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের ১৮৫টিরও বেশি দেশ ও অধীনস্থ অঞ্চলে ৬৭২৭৪৮৪ জন ব্যক্তি করোনাভাইরাস রোগ ২০১৯-এ আক্রান্ত হয়েছেন বলে সংবাদ প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে। এদের মধ্যে ৩৯৩৬৪৮ জনেরও বেশি ব্যক্তির মৃত্যু ঘটেছে এবং ৩২৭০০০৯ হাজারের বেশি রোগী সুস্থ হয়ে উঠেছেন ।

বয়স্ক ব্যক্তি এবং যাদের কোনো ধরণের অসুস্থতা রয়েছে (অ্যাজমা, ডায়বেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ) তাদের মারাত্মক অসুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। চীন থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই করে জানা যায় যে, এই রোগে নারীদের চেয়ে পুরুষের মৃত্যুর সম্ভাবনা সামান্য বেশি।

লেখক : সাংবাদিক, সংগঠক ও সমাজকর্মী

শেয়ার করুনঃ