দ্বিতীয় দফার বন্যা সুনামগঞ্জের নিম্নাঞ্চলের মানুষের জন্য ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে এসেছে। ভারতের পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিপাতের ফলে সৃষ্ট বন্যার পানি মানুষের ঘরবাড়িতে প্রবেশ করায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন তারা।

করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের মধ্যে একদিকে কাজকর্ম বন্ধ, অন্যদিকে বন্যায় পানিবন্দি হয়ে না খেয়েই দিন পার করছেন হাওর পাড়ের বাসিন্দারা। এছাড়া অভিযোগ আছে, বন্যার দুদিন পার হলেও তাদের জন্য কোনো খাবারের ব্যবস্থা করেনি স্থানীয় মেম্বার-চেয়ারম্যানরা। এমনকি তাদের কোনো খোঁজ-খবরও নেননি তারা। এদিকে ভারতের চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টিপাত না কমলে সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতি এমনই থাকবে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের হোসেনপুর, টুকেরগাঁও মনমতোচর ও রাধানগর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পাহাড়ি ঢলে ও টানা বৃষ্টিপাতে এসব এলাকার রাস্তাঘাট পানি নিচের তলিয়ে গেছে। এছাড়া ঘরবাড়িতে পানি প্রবেশ করায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ওই এলাকার একমাত্র কৃষ্ণ মন্দিরটিও বর্তমানে পানির নিচে, যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। এদিকে ঘরে চুলায় পানি ঢুকে যাওয়ায় রান্না করে খেতেও পারছেন না তারা। পেটের তাগিদে নৌকায় বাজারে গিয়ে শুকনা চিড়া-মুড়ি কিনেই বাড়ি ফিরে পরিবারের সাথে ভাগ করে চলছে তাদের পানিবন্দি জীবন। করোনাভাইরাসের কারণে বেকার অনেক মানুষ, তার ওপর বন্যায় পানি ঘরের খাট পর্যন্ত ওঠায় ছেলেমেয়ে নিয়ে অনেকে কষ্টে দিন পার করছেন। তাদের সহায়তায় এখন পর্যন্ত প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধি কেউই এগিয়ে আসেনি।

অন্যদিকে সুরমা নদীর পানি সন্ধ্যা পর্যন্ত বিপৎসীমার ৪৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় জেলা শহরের সাথে বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর, জামালগঞ্জ ও দোয়ারাবাজার উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এছাড়া সুনামগঞ্জ শহরের উকিলপাড়া, কাজির পয়েন্ট, ধোপাখালী, উত্তর আরপিন নগর, নতুনপাড়া ও নবীনগর এলাকার ঘরবাড়িতে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে।

গৌরারং ইউনিয়নের হোসেনপুর এলাকার বাসিন্দা সজল দাশ বলেন, ‘আমি মিলে কাজ করি। বন্যার পানি আইয়া আমার মিলে হাঁটু পানি। কাম-কাজ বন্ধ। আমরার কেউ এখনো খোঁজ-খবর নিছে না, আমরা ভালা আছি না মন্দ আছি। আমার ঘরের মেজো ভাইয়ের বাসার ভেতরে হাঁটুপানি। আমরা খুব কষ্টের মধ্যে আছি।’

একই গ্রামের বৃদ্ধা রফিকুন নেছা বলেন, ‘দুদিন ওই গেছে পানি উঠছে। ঘরের চুলাটাই পানির নিচে কিচ্ছু রানতে পারি না। ছেলে বাজারো গেছে চিড়া-মুড়ি কিনান। ছেলেটা আইলে পরে নাতিটারে লইয়া খাইমু। আমরারে কেউ এখন একমুট চিড়াও দিসে না। ঘরের মধ্যে পানি আর আজকে আরও বৃষ্টিতে পানিতো খাটো উঠি যাইবো। পরে ঘুমাইতেও পারতাম না।’

মনমতো চর গ্রামের বাসিন্দা আতিকুর রহমান বলেন, ‘আমার ৭০০ হাঁস আছিল। বন্যার পানিতে দুশর মতো হাঁস পানিত ভাসিয়া গেছে গি। এখন যা আছে এইগুলারেও কোনো রকমে রাখছি। নিজের ঘরেরই চুলা জ্বলে না দুদিন ধরি। হাঁস-গরুরে খাবার দিতাম কই থকি। আমাদের গ্রামে কেউ এখন কোনো সহযোগিতা করছে না, শুকনা খাবারও দিছে না।’

কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন হোসেনপুর গ্রামের ৭০ বছর বয়সী দিলার বেগম। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেটা মারা যাওয়ার পর থকি আমি ও আমার ছেলের বউ দিনমজুরের কাজ করি। কিন্তু এখন বন্যায় কোমর পানি। চারটা নাতি-নাতনি আমার। এরারে আমি ভাত দিতে পাররাম না। যদি পাশে বাড়ি থকি দেয় তাইলে আগে তারারে খাওয়াই। আমরা পানি আইলে আমরারে কেউ চিনে না, কিন্তু ভোট আইলে পাও ধরি সালাম করে।’

গৌরারং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ফুল মিয়া বলেন, ‘আমি আমার ইউনিয়নের পানিবন্দি মানুষের কথা উপজেলা প্রশাসনকে জানিয়েছি। তারা আমাকে আশ্বাস দিয়েছেন, পর্যাপ্ত পরিমাণ শুকনা খাবার রয়েছে। এখন তারা আমাকে আমার ইউনিয়নের প্রয়োজন অনুযায়ী যদি বরাদ্দ দেন তাহলে আমরা খাবারগুলো পানিবন্দি মানুষের মধ্যে বিতরণ করবো।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়াসমিন নাহার রুমা বলেন, আজকে (রোববার) সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা প্রশাসন থেকে ৬০০ পরিবারকে শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। আগামীকাল থেকে আমরা চাল বিতরণ করবো এবং আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে আমরা প্রতিনিয়ত খাবার পৌঁছে দেব।

এছাড়া সুনামগঞ্জে বন্যা মোকাবিলায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ৪০০ মেট্রিক টন জিআর চাল, নগদ ৮ লাখ টাকা, ২ লাখ টাকার শিশুখাদ্য এবং ২ লাখ গবাদিপশুর খাবার দেয়া হয়েছে। এছাড়া সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় কন্ট্রোল রুম এবং সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের বন্যার্তদের পাশে থাকার জন্য নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, বন্যা মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন প্রস্তুতি নিয়ে কাজ করছে। আমরা দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের দেয়া বরাদ্দগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছি। এছাড়া বন্যার মধ্যে করোনা মোকাবিলায় আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে সাবান ও পানি বিশুদ্ধ ট্যাবলেট রাখতে বলা হয়েছে। আমাদের এখনও তিন লাখ পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট রয়েছে, প্রতি উপজেলায় ২০ হাজার করে পাঠিয়েছি।

সুনামগঞ্জের সর্বশেষ বন্যা পরিস্থিতির বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সবিবুর রহমান বলেন, পানি কিছুটা কমলেও সন্ধ্যার দিকে আবারও সুরমা পানি বিপৎসীমার ৪৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ভারতের চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টিপাত যদি কমে যায় তাহলে আমাদের নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করবে এবং বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

শেয়ার করুনঃ