গোলাপগঞ্জের বুধবারীবাজার ইউনিয়নবাসীর হাতে তুলে দেয়া হয়েছে ভুলে ভরা নকল স্মার্ট কার্ড। এ ইউনিয়নে বিতরণকৃত স্মার্ট কার্ডের মোট সংখ্যার প্রায় ৬০শতাংশ কার্ডকেই নকল বলে অভিহিত করছেন সচেতন মহল।

গত ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে এ ইউনিয়নে স্মার্ট কার্ড বিতরণী কার্যক্রম শুরু হয়ে তা শেষ হয় ১৬ ফেব্রুয়ারি। টানা এ চারদিন ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডবাসীর হাতে স্মার্ট কার্ড তুলে দেন গোলাপগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বশীলরা।

তবে ইউনিয়নবাসী স্মার্ট কার্ড হাতে পেয়ে খুশির বদলে পড়েছেন দুশ্চিন্তায়। কারণ ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডের প্রায় ৬০ শতাংশ নাগরিকদের কার্ডেই ব্যাপক ভুল প্রতীয়মান হয়েছে। কার্ডগুলোতে কারোও কারোও নিজ নামের ভুল, কারোও পিতার নামের ভুল। সবচেয়ে বেশি ভুল রয়েছে গ্রামের নাম নিয়ে। ভুল থেকে বাদ যায়নি পোস্ট অফিসের নাম কিংবা পোস্ট অফিসের নাম্বার পর্যন্ত।

আর এসব ভুল ঘাটাতে গিয়ে দেখা যায় স্মার্ট কার্ডগুলোতে ভুল তথ্য বা বানান থাকলেও সঠিক তথ্য বা সঠিক বানান বিদ্যমান আছে জাতীয় পরিচয়পত্রের অনলাইন সার্ভারে। আর যেহেতু সার্ভারে সঠিক তথ্য রয়েছে তাই হাতে পাওয়া কার্ডগুলোকে কার্যত নকল কার্ডই বলা চলে বলে অভিমত সচেতন মহলের। কেননা সার্ভারের তথ্য অনুযায়ীই কার্ডগুলো প্রিন্ট হয়ে থাকে।

অথচ ইউনিয়নবাসীর হাতে তুলে দেওয়া প্রিন্টেট স্মার্ট কার্ডগুলো কোন সার্ভার থেকে প্রিন্ট করা হলো তা’ই এখন জনমনে প্রশ্ন?

এ অভিযোগের সাথে একাত্মতা পোষণ করেছেন বুধবারীবাজার ইউপি চেয়ারম্যান মস্তাব উদ্দিন কামাল।

তিনি জানান, আমার নিজ ঘরেই একাধিক স্মার্ট কার্ডে ভুল তথ্য রয়েছে। সার্ভারে সঠিক তথ্য থাকার পরও স্মার্ট কার্ডগুলোতে ভুল তথ্য আসায় এগুলোকে তিনি নকল কার্ড বলেই অভিহিত করছেন।

উপরের স্মার্ট কার্ডে গ্রামের নামে ভুল থাকলেও নিচের ছবিতে দেখুন একই নাগরিকের সার্ভার কপি। যেখানে গ্রামের নাম শতভাগ সঠিক রয়েছে

ব্যক্তিগত তথ্য গোপন রাখার নিমিত্ত্বে ব্যক্তির ডাটা প্রকাশ করা হয়নি।

বুধবারীবাজার ইউনিয়নে রয়েছে ৯টি ওয়ার্ডে মোট ১৬টি গ্রাম। জাতীয় স্মার্ট কার্ডে এ গ্রামগুলোর নামকে অত্যন্ত বিকৃতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রায় প্রত্যেকটি গ্রামের বানানে রয়েছে মারাত্মক ভুল। যা নিয়ে পুরো ইউনিয়নবাসী পড়েছেন দুশ্চিন্তায়। অথচ জাতীয় পরিচয় পত্রের সার্ভারে এসব গ্রামগুলোর নাম শতভাগ সঠিক রয়েছে।

চেয়ারম্যান মস্তাব উদ্দিন কামাল জানান, আমার ছেলের স্মার্ট কার্ডে গ্রামের নাম কালিডহর-এর স্থলে দেয়া হয়েছে ‘কালি দাহার’। যা মারাত্মক ভুল। এছাড়াও আমার স্ত্রীর নাম বাংলাতে সঠিক থাকলেও ভুল রয়েছে ইংরেজিতে।

একইভাবে অভিযোগ করেছেন কালিয়াডহর গ্রামের শিপু ইসলাম। তিনি জানান, আমার আগের ন্যাশনাল আইডি কার্ডে এবং অনলাইন সার্ভারে সবকিছু সঠিক থাকলেও স্মার্ট কার্ডে গ্রামের নামের বানানে রয়েছে ‘কালি দাহার’।

ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের চন্দরপুর গ্রামের বাসিন্দা খাইরুল ইসলাম, তারেক আহমদ ও সুহেল আহমদ জানিয়েছেন আমাদের পূর্ববর্তী জাতীয় পরিচয়পত্রে আমাদের গ্রামের নাম সঠিক ছিলো এবং বর্তমানে সার্ভারেও সঠিক রয়েছে। কিন্তু স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্রে গ্রামের নাম চন্দরপুর এর বদলে ‘চান্দরপুর’ দেয়া হয়েছে।

ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের কটলিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা সামিদ আহমদ জানিয়েছেন, আমাদের গ্রামের নাম কটলিপাড়া হলেও স্মার্ট কার্ডে ভুলভাবে দেয়া হয়েছে ‘কাটালি পাড়া’।

২নং ওয়ার্ডের আওই গ্রামের বাসিন্দা সাংবাদিক সোহেল আহমদ জানান, গ্রামের সঠিক নাম আওই হলেও নতুন ভোটার স্মার্ট কার্ডে এসেছে ‘আহাই’।

৩নং ওয়ার্ডের বহরগ্রামের বাসিন্দা রিপন আহমদ জানান, বিপুল সংখ্যক কার্ডে বহরগ্রাম-এর স্থলে দেয়া হয়েছে ‘বাহারগ্রাম’।

৫নং ওয়ার্ড বাগিরঘাট গ্রামের বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম জানান তাদের কারোও কারোও কার্ডে গ্রাম এবং পোস্ট অফিস দেয়া হয়েছে চন্দরপুর। যা মারাত্মক ভুল।

৬নং ওয়ার্ডের বনগ্রামের বাসিন্দা মুরাদ আহমদ জানান, তাদের পোস্ট অফিস কোড ৩১৬৫ হলেও স্মার্ট কার্ডে দেয়া হয়েছে ৩১৭৬।

৭নং ওয়ার্ড বানিগাজী গ্রামের বাসিন্দা ইমরান আহমদ ও খসরুজ্জামান জানান, গ্রামের নাম বানিগাজী হলেও স্মার্ট কার্ডে দেয়া হয়েছে ‘বনি গাজী’!

৮নং ওয়ার্ড চন্দরপুর গ্রামের বাসিন্দা সাইফুল হক, মুহিব রহমান, রুহুল আমীন জানান, আমাদের গ্রামের অসংখ্য মানুষের কার্ডে ব্যাপক ভুল রয়েছে। বিশেষ করে গ্রামের বিকৃত নাম লক্ষণীয়।

৯নং ওয়ার্ডের লামাচন্দরপুর গ্রামের বাসিন্দা জুনেদুর রহমান খান জানান, আমাদের পোস্ট অফিস চন্দরপুর হলেও স্মার্ট কার্ডে দেয়া হয়েছে আছিরগঞ্জ বাজার।

এছাড়াও পুরো ইউনিয়নের প্রায় ৬০শতাংশ নাগরিকদের স্মার্ট কার্ডে এমন ভিন্ন ভিন্ন ভুল দৃশ্যমান রয়েছে। যা বিভিন্ন প্রয়োজনে ইউনিয়নবাসীকে মারাত্মক বিপাকে ফেলবে। এমন ভুল তথ্য সম্বলিত জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে কোনভাবেই নাগরিক সেবা পাওয়া সম্ভব নয় বলে মত দিয়েছেন সচেতন মহল। বিশেষ করে পাসপোর্ট তৈরি কিংবা ব্যাংকিং কার্যক্রম-সহ অসংখ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হবেন তারা।

গোলাপগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা সাইদুর রহমানের সাথে ফোন কলে কথা হলে তিনি নকল কার্ডের অভিযোগটি অস্বীকার করেন। সার্ভারে সঠিক তথ্য থাকার পরও স্মার্ট কার্ডে কেন ভুল রয়েছে সে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এমন অভিযোগ এখনও শুনিনি। ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, মেম্বারগণ কিংবা ইউনিয়নের কেউই এব্যাপারে কিছু জানাননি। বিষয়টির অফিসিয়াল অভিযোগ পেলে তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন বলে আশ্বাস প্রদান করেন।

শেয়ার করুনঃ